আজকাল বাজারে এত শত ব্র্যান্ড আর ফোন কোনটা ছেড়ে কোনটা কিনবেন তা ভেবে বিভ্রান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞাপন দেখে বা শুধু চকচকে ডিজাইন দেখে ফোন কিনে পরে আফসোস করার কোনো মানে হয় না। আপনি যদি ২০২৬ সালে এসে নিজের কষ্টার্জিত টাকায় একটা নতুন ফোন কেনার প্ল্যান করে থাকেন তবে শোরুমে যাওয়ার আগে এই ১০টি বিষয় একটু ভেবে দেখুন।
১।আগে বাজেট ঠিক করুন তারপর ফোন খুঁজুনঃসবচেয়ে বড় ভুলটা আমরা এখানেই করি! বাজেট ২০ হাজার টাকা অথচ আমরা রিভিউ দেখি ৫০ হাজার টাকার ফোনের। এতে নিজের ফোনের প্রতি শুরুতেই একটা অসন্তোষ তৈরি হয়। তাই আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করবেন ফোনটা দিয়ে মূলত কী করবেন গেমিং, নাকি সাধারণ ফেসবুক ইউটিউব বাজেট আর প্রয়োজন ঠিক থাকলে অর্ধেক সিদ্ধান্ত সেখানেই হয়ে যায়।
২। প্রসেসরঃঅনেকে শুধু ব্র্যান্ড বা মডেল দেখে ফোন কেনেন প্রসেসর কী জিনিস খেয়ালই করেন না। সহজ কথায় প্রসেসর হলো ফোনের ইঞ্জিন বা মস্তিষ্ক। আপনি অ্যাপ খুলবেন গেম খেলবেন নাকি ছবি এডিট করবেন সবকিছু কতটা দ্রুত আর স্মুথ হবে তা ঠিক করে এই প্রসেসর। আপনি যদি শুধু মেসেজিং ফেসবুক আর ইউটিউব চালান তবে খুব হাই প্রসেসরের দরকার নেই। কিন্তু ভারী গেমিং বা ভিডিও এডিটিংয়ের শখ থাকলে প্রসেসরে ছাড় দেওয়া চলবে না।
৩। RAM নাকি Storage? কোনটা কতটুকু লাগবেঃ এই দুটো বিষয় নিয়ে অনেকেরই প্যাঁচ লেগে যায়। RAM হলো একসাথে কতগুলো অ্যাপ আপনি ব্যাকগ্রাউন্ডে স্মুথলি চালাতে পারবেন। আর Storage হলো আপনার ছবি গান ফাইল জমা রাখার জায়গা (যেমন: 8GB RAM + 128GB Storage)। সাধারণ ব্যবহারের জন্য ৬ বা ৮ জিবি র্যামই যথেষ্ট। তবে আপনি যদি প্রচুর ভারী অ্যাপ বা গেম চালান তবে একটু বেশি র্যাম ভালো। আর স্টোরেজের ক্ষেত্রে নিজের অভ্যাসের দিকে তাকান—প্রচুর ছবি ভিডিও তোলার অভ্যাস থাকলে একটু বড় স্টোরেজের দিকেই যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৪। ডিসপ্লেঃ চোখের আরামটাই আসল সারাদিন তো ফোনের ডিসপ্লের দিকেই তাকিয়ে থাকবেন তাই স্ক্রিনটা ভালো হওয়া চাইই চাই। ফোন কেনার সময় স্ক্রিনের সাইজ রেজুলেশন আর রিফ্রেশ রেট খেয়াল করুন। আজকাল ১২০Hz রিফ্রেশ রেট বেশ জনপ্রিয় এতে স্ক্রল করা বা অ্যানিমেশন বেশ মাখনের মতো স্মুথ লাগে। তবে শুধু ১২০Hz লেখা দেখলেই হবে না রোদ্রে স্ক্রিন ঠিকমতো দেখা যায় কি না (Brightness) এবং রঙের কোয়ালিটি কেমন তাও দেখে নেওয়া উচিত।
৫।মেগাপিক্সেলের ফাঁদে পা দেবেন নাঃঅনেকে ভাবেন ৫০ মেগাপিক্সেলের চেয়ে ১০৮ মেগাপিক্সেল মানেই সেরা ক্যামেরা সত্যি বলতে ক্যামেরা কেমন হবে তা শুধু মেগাপিক্সেলের ওপর নির্ভর করে না। সেন্সরের সাইজ কালার প্রসেসিং সফটওয়্যার এবং লাইটিংয়ের ওপর আসল ছবির কোয়ালিটি নির্ভর করে। তাই কাগজের স্পেসিফিকেশন না দেখে সম্ভব হলে সেই ফোনে তোলা আসল ছবি বা ইউটিউবে ক্যামেরা রিভিউ দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
৬। ব্যাটারি ও চার্জিং স্পিডঃ যতই দামি ফোন হোক দিনশেষে চার্জ না থাকলে সেটা শুধু একখণ্ড প্লাস্টিক তাই ব্যাটারির ক্যাপাসিটি (যেমন: 5000mAh) এবং চার্জিং স্পিড দেখে নেওয়া জরুরি। তবে শুধু mAh বেশি হলেই যে ব্যাটারি দিন পার করে দেবে তা কিন্তু নয়। ফোনের প্রসেসর আর সফটওয়্যার কতটা চার্জ বাঁচায় তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। তবে আপনি যদি সারাদিন গেম খেলেন বা ভিডিও দেখেন তবে বড় ব্যাটারি আর দ্রুত চার্জিং সুবিধা আপনার জন্য লাইফসেভার হবে।
৭। সফটওয়্যার আপডেট কতদিন পাবেনঃ এই বিষয়টা বেশিরভাগ মানুষই এড়িয়ে যান। ফোন কেনার আগে জেনে নিন কোম্পানি কত বছর পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড ওএস এবং সিকিউরিটি আপডেট দেবে। লম্বা সময় আপডেট পেলে ফোন বহুদিন নতুন ফিচারে সচল থাকে এবং হ্যাকিং বা সিকিউরিটি সমস্যা কম হয়। তাই শুধু ফোনের বডি বা হার্ডওয়্যার নয়, সফটওয়্যার সাপোর্টের দিকেও নজর দিন।
৮। ফাইভ-জি (5G) নাকি ফোর-জি (4G)ঃ এখন প্রায় সব ফোনেই ৫জি সাপোর্ট থাকে। ৪জি-র চেয়ে ৫জি অনেক দ্রুতগতির ইন্টারনেট দেয় সন্দেহ নেই। তবে আসল কথা হলো আপনার এলাকায় আদৌ ৫জি নেটওয়ার্ক বা ভালো কভারেজ আছে তো যদি থাকে এবং আপনি দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করতে চান তবে ৫জি ফোন নেওয়াটা ভবিষ্যতের জন্য ভালো বিনিয়োগ।
৯। ফোনের স্থায়িত্ব ও প্রোটেকশন (Build Quality)ঃফোন তো আর আলমারিতে তুলে রাখার জিনিস নয় হাত থেকে ফুটপাতে পড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক তাই ফোনটি কতটা মজবুত তা দেখে নিন। কিছু ফোনে IP67 বা IP68 রেটিং থাকে যার মানে ফোনটি ধুলাবালি ও পানি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবে। এছাড়া ব্যাক প্যানেল এবং স্ক্রিনে গরিলা গ্লাসের মতো ভালো প্রোটেকশন আছে কি না তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।
১০।অফিশিয়াল ওয়ারেন্টিঃঅফিশিয়াল ওয়ারেন্টি আছে তো শেষ কথা কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কখনোই সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে আনঅফিশিয়াল বা গ্রে মার্কেটের ফোন কিনতে যাবেন না। কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন ফোনটি অফিশিয়াল কি না এবং আপনার আশেপাশে তাদের সার্ভিস সেন্টার আছে কি না। ফোনে কোনো সমস্যা হলে যেন সহজেই সার্ভিস পান সেই গ্যারান্টি থাকাটা খুবই দরকার।
শেষ কথাতাহলে কোন ফোনটা আপনার জন্য সেরা উত্তরটা সহজ যা অন্যের জন্য সেরা তা আপনার জন্য নাও হতে পারে।আপনি যদি গেমার হন তবে ভালো প্রসেসর আর কুলিং সিস্টেম আগে দেখুন।আপনি যদি ছবি তুলতে ভালোবাসেন তবে ক্যামেরার ওপর জোর দিন।আর আপনি যদি কাজের প্রয়োজনে সারাদিন ফোন ব্যবহার করেন তবে ভালো ডিসপ্লে ও ব্যাটারিকে প্রাধান্য দিন।
ফোন কেনার সময় তাড়াহুড়ো না করে আগে নিজের প্রয়োজনটা বুঝুন, তারপর স্পেসিফিকেশনগুলো মিলিয়ে দেখুন। একটু ভেবেচিন্তে পা বাড়ালে ঠকার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে!